করোনাকালীন প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ - রাকিব হাসান

করোনাকালীন প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ - রাকিব হাসান বহু বিবাহের কুফল  কৈশোরে বিয়ে না করার ব্যাপারে ব্যক্তিগত ইচ্ছাই একমাত্র উপায়  বহুবিবাহের কুফল  বিবাহের সংজ্ঞা  বিবাহ সংক্রান্ত আইন  মুসলিম বিবাহ আইন বাংলাদেশ

করোনাকালীন প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহ

রাকিব হাসান।। সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অবশ্য কোভিড পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা যে বাড়বে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। করোনাকালে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ বাল্যবিবাহ হয়েছে। গত ১০ মাসে কমপক্ষে ৫ হাজার বাল্যবিবাহ হয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে ২০১৭ সালে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, কোনো নারী ১৮ বছরের আগে এবং পুরুষ ২১ বছরের আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে বিবাহসংশ্লিষ্টদের জেল-জরিমানা করা হবে। 


বাল্যবিবাহের দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, এদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বয়স ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়।আর ২২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৫ বছরের আগে। 

করোনাকালে স্কুল বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা,পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রভাবে অভিভাবকেরা গোপনে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ত্রাণ ও সংক্রমণের বিস্তার রোধে ব্যস্ত থাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তেমনভাবে নজর দিতে পারেনি। 

অর্থনৈতিক সংকটে পরিবারগুলো বাজেট কমাতে চায়।এতে সহজ পদ্ধতি হিসেবে তাঁরা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিতে চায়। করোনাকালের শুরুতে এ প্রবণতা থেকেই অনেক অভিভাবক মেয়েদের গোপনে বিয়ে দিয়েছেন। 

এক স্কুলেই ২০ বাল্যবিবাহঃ
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার ধানুড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল ৭১ জন। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয় ৬৩ জন। তবে শেষ পর্যন্ত সেখানে টিকে থাকে ৪৯ ছাত্রী। ঝরে পড়াদের বেশিরভাগ বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে বলে মনে করেন স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মোঃ আলমগীর। তিনি বলেন, 'অভিভাবকদের অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে মেয়েদের বিয়ে ঠেকিয়ে পড়ালেখায় যুক্ত রাখার চেষ্টা করতাম।  কিন্তু করোনাকালে সেটা সম্ভব হয়নি। এ সময় কমপক্ষে ২০ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বেশিরভাগই নবম শ্রেণির। বয়স কম থাকায় অনেক মেয়ের বিয়ের নিবন্ধন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের দুই-তিন মাস পর মেয়েটিকে বাবার বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়'।

করোনাকালীন সময়ে অনেক প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। অনেক মা-বাবা ফেরত আসা প্রবাসীদের সঙ্গে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। 

ব্র্যাকের গবেষণায় বলা হয়েছে,  ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহ হয়েছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে। ৭১ শতাংশ হয়েছে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। বাইরে থেকে আসা ছেলে হাতের কাছে পাওয়া ৬২ শতাংশ বিয়ের কারণ ছিল। এখন স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার প্রশাসন করোনাকে প্রাধান্য দিয়েছে। বাকি কার্যক্রমগুলো প্রাধান্যের তালিকায় নিচের দিকে চলে গেছে। এজন্য নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে। 

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নিনা গোস্বামী বলেন, 'জোর করে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে।  আর আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, প্রত্যন্ত এলাকায় বাল্যবিবাহ বেড়ে যাচ্ছে। '

বাল্যবিবাহ ও উত্যক্ততা ঠেকানোর জন্য মাইকিং, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো যায়। যারা স্থানীয় প্রশাসনে ফোন করে নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকাতে নিজেরা সহায়তা করে তাদেরকে পুরস্কৃত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। মেয়েদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে যদি মেয়েরা উপার্জনের মাধ্যমে অবদান রাখতে পারে, তাহলে নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও সচেতন  হবে। বাল্যবিবাহ যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তা এখনো অনেকে জানেন না। বাল্যবিবাহ রোধে পরিবার থেকে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা এবং তরুণদের সচেতন করতে হবে। 

করোনা পরিস্থিতিতে নতুন নতুন অসংখ্য সমস্যার মধ্যে বাল্যবিবাহ সম্পর্কে সরকারের মনোযোগ কিছুটা সরে গেছে বলে মনে হয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনকে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। আর প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলনের। যে হারে বাল্যবিবাহ বাড়ছে, তাতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ দরকার। 

 

 
নামঃ রাকিব হাসান 
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, পলাশী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য